১৯৭০ সালঃ আমি তখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। ভিপি এম. এ. রেজা তখন সেই কলেজের তুখোর ছাত্রনেতা। পরবর্তীতে বাবা জালাল নূরীর জামাতা, মুরিদ ও খলিফা, মুক্তিযুদ্ধকালিন অস্থায়ী সরকারের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের সেক্রেটারী, আওয়ামী যুব লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জনাব এম. এ. রেজা বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এম. এ. রেজার মাধ্যমে সুরেশ্বর দরবার শরীফের পীর সাহেব জালাল নূরী হুজুরের কাছে দোয়া চান। তখন বাবা জালাল নূরী আফিয়ানহু হুজুর বঙ্গবন্ধুকে সুরেশ্বর দরবার শরীফ জিয়ারতের জন্য আমন্ত্রণ জানান। বঙ্গবন্ধু আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং ১৯৭০ সালের আগষ্ট মাসে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সুরেশ্বর দরবার শরীফে আগমন করেন। তিনি দরবার শরীফে আসলে বাবা জালাল নূরী তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানান এবং তাঁর আগমন উপলক্ষ্যে বাবাহুজুরের নির্দেশে আমরা ভাইগণ মিলে কয়েকটি তোরণ নির্মাণ করি। অতঃপর বঙ্গবন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে জালাল নূরী হুজুর হযরত সুরেশ্বরী বাবা ও তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র নূরী শাহ বাবার রওজা শরীফ জিয়ারত করেন, পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন এবং বাবা হুজুরের সাথে বঙ্গবন্ধু ও উপস্থিত অসংখ্য জনগণ মোনাজাতে শরীক হন। রওজা জিয়ারত শেষে বঙ্গবন্ধু বাবা জালাল নূরী হুজুরের সাথে তাঁর বসত বাড়িতে যান এবং সেখানে কিছু সময় একান্ত সৌজন্য আলোচনায় শামিল হন। বঙ্গবন্ধুর আগমনের খবর জানতে পেরে এরই মধ্যে রওজা শরীফের বিশাল মাঠ প্রাঙ্গন লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। যেহেতু এ আগমন ছিলো অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, তাই কোনো মঞ্চ নির্মাণ করা হয়নি। মঞ্চ নির্মাণ না করায় তাৎক্ষনিকভাবে দরবারের দ্বায়রা শরীফের উঁচু বারান্দা চত্বরকে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং সেখানে একটি চেয়ারে দরবার শরীফের মোতোওয়াল্লী ও গদীনশীন পীর কেবলা হযরত সাইয়্যেদ শাহ সূফী জালাল নূরী আফিয়ানহু বসেন এবং তারই বাম পাশের চেয়ারে বঙ্গবন্ধু বসেন। সভার সভাপতিত্ব করেন হাজী মমিন আলী বেপারী। আমরা আওলাদগণ এবং বঙ্গবন্ধুর সফরসসঙ্গীরাসহ সকলে তাঁদের পেছনে সাবিদ্ধভাবে দাঁড়ানো ছিলাম। উপস্থিত জনগণের উদ্দেশ্যে তখন বঙ্গবন্ধু সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তাঁর নির্বাচনী আরো সফর থাকায় দক্ষিণবঙ্গে যাত্রার উদ্দেশ্যে বক্তব্য শেষে তিনি যাবার জন্য বাবা হুজুরের হাত ধরে দোয়া ও বিদায় চান। বাবাহুজুর বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ইনশাআল্লাহ আপনি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও উচ্চ মর্যাদা আল্লাহপাক আপনাকে দান করবেন। তবে ক্ষমতায় গেলে আপনি আমাদের জন্য কি করবেন? বঙ্গবন্ধু প্রশ্নের উত্তরে বলেন, হুুজুর, আপনাদের জন্য আমি কি করতে পারি আপনিই বলুন। তখন বাবা হুজুর বললেন, আমরা সূফী-দরবেশরা, তরিকতের পথের পথিকরা শান্তিপ্রিয় সহজ-সরল নির্বিবাদী মানুষ। ইসলামের লেবাসধারী এক শ্রেণীর উগ্র-কট্টরপন্থী তথাকথিত মোল্লাদের দ্বারা আমরা নির্যাতিত, অপদস্থ, তাদের অত্যাচার ও অপ-প্রচারে আমরা জর্জরিত। তাই আমরা যেন নিশ্চিন্তে, নির্বিঘেœ ও শান্তিতে ধর্মকর্ম পরিপালন করতে পারি এটাই আপনার কাছে আমার আবেদন। তখন বঙ্গবন্ধু সাথে সাথেই বললেন, আমি কথা দিচ্ছি হুজুর, আমি ক্ষমতায় গেলে এই দেশে ধর্মনিরপেক্ষ শাসন পদ্ধতি কায়েম করবো। বাবা হুজুর সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুরেশ্বরীয়া সকল ভক্ত-প্রেমিক-আশেক-মুরিদ এবং অন্যান্য দরবার-খানকাসমূহের পীর-মাশায়েখ ও ভক্ত-মুরিদদের প্রতি আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করার জন্য ও ভোট দেয়ার জন্য এবং বঙ্গবন্ধুর হাতকে শক্তিশালী করার জন্য উদাত্ত আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও জয়োরত সর্ম্পকে তৎকালীন জাতীয় দনৈকি ইত্তফোক পত্রকিাসহ অন্যান্য পত্রকিায় সচত্রি প্রতবিদেন প্রকাশতি হয়ছেেিলা। অতঃপর ৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু বিপুল ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সত্তে¡ও তাঁকে ক্ষমতা না দেয়া হলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৭১- এর ৭ মার্চ ভাষণের প্রেক্ষাপট রচিত হয়। সেদিনের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আমি ও বাবাহুজুর অত্যন্ত মনোযোগের সাথে রেডিও-তে শুনতে থাকি, বাবা হুজুর তখন চক্ষু বন্ধ অবস্থায় অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ছিলেন। ভাষণ শেষে তিনি চোখ খুলে বলেন- এই একটি মাত্র ঐতিহাসিক ভাষণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলোরে বেলাল। এই স্বাধীনতাকে আর কেউ রুখতে পারবে না। আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, তা কি করে সম্ভব, পাকিস্তানের মতো একটি শক্তিশালী সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন কীভাবে সম্ভব? প্রতিউত্তরে বাবাহুজুর বললেন, বাংলার জমিন, আকাশ-বাতাস, নদী-নালা, গাছপালা সর্বত্রই ‘জয় বাংলা’ শোøগানে মুখরিত, সর্বত্রই বাংলার স্বাধীনতা চাচ্ছে। যদি এই স্বাধীনতা রুখতে হয় তবে পাকিস্তানকে বাংলার জমিনের আড়াই হাত নীচ পর্যন্ত মাটি তুলে নিয়ে বঙ্গপোসাগরে ফেলে দিতে হবে। তা করা যেমন সম্ভব নয় তেমনি বাংলার স্বাধীনতাও রুখে দেয়া তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। আমি বাবাহুজুরের কথায় গভীরভাবে আশ্বস্ত হলাম, কারণ, বাবাহুজুরের কথা কখনো বিফলে যেতে দেখিনি। ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে সুরেশ্বর দরবার শরীফের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধাদেরকে যথাসাধ্য সহযোগীতা করি এবং তাদেরকে খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে সেবা প্রদান করি। বাবাহুজুরের আদেশে আমি বেলাল নূরী মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ ও ট্রেনিং গ্রহণের নিমিত্তে আমার ফুফাতো ভাই তৌহিদুল ইসলাম কয়েস ও রাকিবকে সাথে নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। কুমিল্লা বেগুনবাড়ি বর্ডার দিয়ে যাত্রা করে আমরা আসামের শিলচরে যেয়ে উপস্থিত হই এবং সেখানে যেয়ে আমরা নানাহ সমস্যার সম্মুখীন হই। এ সময় আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ মিশনের সাথে যোগাযোগ করি। সেই সময়কার স্বাধীন বাংলাদেশ মিশনের ফরেন সেক্রেটারী কামাল সিদ্দিকী সাহেব একটি চিঠি লিখে দেন যে, এরা তিনজন বিশিষ্ট্য মুক্তিযুদ্ধা, এদেরকে সকল প্রকার প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগীতা করার জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ জানাই। পরবর্তীতে স্বাধীন সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ সরকার কায়েম হয়। এর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে দুষ্কৃতকারীরা এই মহান নেতা, বঙ্গ শার্দুল, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গাল
সাইয়্যেদ শাহ সূফী ফারুক নূরী আল সুরেশ্বরী

0 Comments